লিবিয়া

লাইফ ইন লিবিয়া: অপরিচিতদের কাছ থেকে সাহায্য

স্পেকটেটর ইনডেক্সে বিশ্বের সেরা দশটা দেশের একটা লিস্ট আছে, যেসব দেশের নাগরিকরা রাস্তায় অপরিচিত মানুষদেরকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। সেই লিস্টে এক নম্বর দেশটার নাম হচ্ছে লিবিয়া।

গত বছরের এই দিনে (২ জানুয়ারি, ২০২০) অপরিচিত মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে সময় নানান ঝামেলার কারণে লেখা হয়নি, আজ লিখছি।

সেদিন আমি সিরত থেকে যাচ্ছিলাম প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরের মুরাদা শহরের একটা অয়েল ফিল্ডে। শহরটা ডেজার্টের ভেতর। প্রথমে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হাইওয়ে আছে, কিন্তু এরপরের ৩০০ কিলোমিটারের অধিকাংশই ভাঙ্গা রাস্তা। আর শেষ ১০০ কিলোমিটারে তো রাস্তাই নাই, সাহারার বালির উপর দিয়ে জীপ বা ফোর হুইলার ছাড়া যাওয়ার উপায় নাই।

গাড়ি চালাচ্ছিল কোম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হুসাম। হিউন্দাই সান্তাফে এসইউভি। ৩০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর জনবিরল একটা এলাকায় হঠাৎ গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। মনে নাই পুরাপুরি, সম্ভবত গিয়ারবক্স নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। গাড়ি পুরাপুরি অচল। একটুও নড়ে না।

আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা। পরদিন হুসামের জরুরী একটা মিটিং আছে। আমারও জরুরী কাজ আছে। যেভাবেই হোক রাতে রাতেই আমাদেরকে সাইটে পৌঁছতে হবে। এখন এই জনবিরল এলাকায় গাড়ির গ্যারেজ বা মেকানিক পাবো কোথায়? পেলেও ঠিক করতে কয় ঘণ্টা লাগবে? আমরা গাড়ি ঠেলে রাস্তা থেকে পাশে নামিয়ে হতাশ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

জায়গাটা ছিল ব্রেগা শহরের একটু পরে, ছোট একটা গ্রামের মতো। দূরে কিছু জনবসতি ছিল। সেদিক থেকেই প্রথমে একজন গাড়িতে করে এগিয়ে এলো। বিপদে পড়েছি বুঝতে পেরে নিজেই কাছে এসে জিজ্ঞেস করল কী সমস্যা। এরপর জানতে পেরে হুসামকে নিজের গাড়িতে করে দূরের এক মেকানিকের কাছে গেল। আমি গাড়িতে বসে রইলাম।

সেই মেকানিক এসে গাড়ি দেখে মত দিলো, এখানে কিছু হবে না, গাড়ি উঠিয়ে পাশের শহরে নিতে হবে, সহজ কথায় দুই দিনের ব্যাপার। আজ এমনিতেই সন্ধ্যা হয়ে আসছে, কিছু করার নাই। আমরা স্থানীয় লোকটার দিকে তাকালাম বিকল্প কোনো আশ্বাস শোনার জন্য। সে বলল, বিকল্প কিছু নাই। আজ কিছু হবে না। তোমরা রাতে আমার বাসায় থেকে যাও, কাল সকালে গাড়ি তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিবো।

কিন্তু আমাদের পক্ষে তো সেটা সম্ভব না। আমাদেরকে সকালের আগেই সাইটে পৌঁছতে হবে, যেভাবেই হোক। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, গাড়িটা এখানেই স্থানীয় কারো বাড়িতে রেখে যাবো। এরপর ট্যাক্সি জোগাড় করে রাতেই সাইটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। এরপর ঐ লোকের কাছ থেকে গাড়ি সংগ্রহ করে সেটা কীভাবে ঠিকঠাক করা হবে, সেটা কোম্পানির ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা বুঝবে, আমাদের মাথা ঘামানোর কী দরকার?

ততক্ষণে স্থানীয় আরো কয়েকজন এসে জড়ো হয়েছে। হুসাম তাদেরকে গাড়ি রেখে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানালো। এরকম ক্ষেত্রে লিবিয়ানদের একটা কমন ডায়লোগ আছে, তারা সেটাই বলল – “বেইত বেইতকুম” – অর্থাৎ “আমার বাসা তোমাদেরই বাসা।” যতদিন দরকার গাড়ি রেখে যাও, কোনো সমস্যা নাই, কেউ ধরবে না।

রাজি হওয়ার পরেও অবশ্য তারা দল বেঁধে জোরাজুরি করতে লাগলো যেন রাতে তাদের ওখানে থেকে যাই, অন্ততপক্ষে যেন রাতের খাবার খেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের সেই সময় ছিল না। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা শহরে, সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা পরিবারের বাড়ির সামনে আমরা গাড়িটা পার্ক করে রাখলাম। এরপর সেই বাড়ির মালিকের তিন ধাপ বিশিষ্ট নাম (নাম, বাবার নাম, বংশের নাম) আর ফোন নাম্বার জেনে নিয়ে কোম্পানির একজনকে এসএমএস করে দিলাম। এরপর গাড়ির চাবিটাও সেই বাড়ির মালিকের হাতে তুলে দিয়ে ফিরে রাস্তায় ফিরে এলাম ট্যাক্সির সন্ধানে।

তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা সাতটা। শীতের দিন, জোর বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাস্তা কাদায় মাখামাখি। কোনো ট্যাক্সি মুরাদা শহরের দিকে যেতে রাজি হয় না। একে তো রাত, তার উপর বৃষ্টির পানিতে ভাঙ্গা রাস্তায় গাড়ি চালানো খুবই রিস্কি। বাড়ির মালিকদের আরেক বৃদ্ধ আত্মীয় তার গাড়িতে করে সেই সন্ধ্যা থেকে আমাদেরকে এই বৃষ্টির মধ্যে নিয়ে ট্যাক্সির খোঁজে ঘুরতে লাগলো।

নেটওয়ার্কে ঝামেলা করছিল, অনেককেই ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না, সে আমাদেরকে নিয়ে একবার এর বাড়িতে, আরেকবার ওর বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন জনকে রিকোয়েস্ট করতে লাগলো আমাদেরকে মুরাদায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। শেষ পর্যন্ত একটা ট্যাক্সি যখন আমরা পেলাম, তখন রাত এগারোটা। আমাদেরকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দেওয়ার পরেই কেবল সেই বৃদ্ধ ফেরত গেল।

মুরাদায় আমি পাঁচ দিন ছিলাম। ষষ্ঠদিনের দিন সিরতে ফিরে যাওয়ার সময় হুসামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, গাড়িটার কী অবস্থা, ঠিক হয়েছে? হুসাম জানালো, এখনও কেউ ঐ বাড়িতে গিয়ে গাড়িটা তুলেই আনেনি। কোম্পানির যার উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে একটু ব্যস্ত। আরো কয়েকদিন পর ফ্রি হলে সময় করে যাবে। সমস্যা নাই, ফোনে কথা হয়েছে, ওরাও বলেছে দুশ্চিন্তা করতে না, গাড়ি ওদের গ্যারেজের ভেতরেই আছে।

মেট্রোপলিটন শহরে এই ধরনের ব্যাপারগুলো কম দেখা যায়। সেখানে সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সেখানে পরিচিতরাও অনেক সময় একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু শহরের ভিড় থেকে একটু বাইরে গেলে যেখানে মানুষ এখনও যৌথ পরিবারে বাস করে, যেখানে ফ্যামিলিয়াল, সোশ্যাল এবং ট্রাইবাল বন্ড এখনও স্ট্রং, সেখানকার ব্যাপারগুলোই অন্যরকম।

এই যে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা পরিবার এই শীতের, বৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য এত কষ্ট করেছে, বা এই যে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা শহরে, অপরিচিত একটা পরিবারের কাছে প্রায় লাখ দিনার দামের গাড়ি রেখে কোম্পানির লোকেরা নিশ্চিন্তমনে ঘুমিয়ে থাকতে পারছে, এর কারণটা এই সামাজিকতা। এই সামাজিক এবং গোত্রগত বন্ধন এবং দায়বদ্ধতা টিকে আছে বলেই মানুষের এখনও বিশ্বাস আছে, সেখানে কেউ কারো হক মেরে খাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.