লেবানিজ শিল্পী ফাইরুজ এর গান লি বাইরুত
ভিডিও

ফাইরুজের লি বাইরুত

ফাইরুজ নামটা কেন যেন বাংলাদেশে একটু কম পরিচিত। উম্মে কুলসুমকেই মানুষ বেশি চেনে। কিন্তু আরব বিশ্বে, বিশেষ করে লিবিয়াতে ফাইরুজের গানের জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। এখানকার অনেকগুলো রেডিও স্টেশনই সকালে কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে ওপেন করার পর নিয়ম করে আধ ঘন্টা পর্যন্ত ফাইরুজের গান বাজায়, উম্মে কুলসুমের গান না।

ফাইরুজের গানের প্রতি আমার এক ধরনের ফ্যাসিনেশন আছে। ২০১৩ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরুনোর পর যখন নতুন চাকরিতে যোগ দেই, তখন পোস্টিং ছিল সিরতের গার্বিয়াত সাইটে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বসের গাড়িতে করে সাইটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতাম।

রাতে দেরিতে ঘুমাতাম বলে গাড়ির ২০-২৫ মিনিটের যাত্রা পুরোটাই কাটত তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে। আর সে সময় এফএম রেডিওতে ফাইরুজের গান শুনতে শুনতে এক ধরনের ঘোরের মধ্যে চলে যেতাম। এরপর সারাদিন সেই সুর আর কথাই কানে বাজত।

ফাইরুজের গান একইসাথে বিপুল জনপ্রিয় এবং সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত। শুধু সুর না, তার গানের লিরিকগুলোও অসাধারণ। আরবের নাইটিঙ্গেল হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে পশ্চিমা বিশ্বেও।

ফাইরুজের “লি বাইরুত” গানটা আমার খুবই পছন্দের একটা গান। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার বার তো শুনেছিই। গানটার সুর এবং কথাগুলো এমন, প্রতিবার শোনার সময়ই বুক ভারি হয়ে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০১১ সালের যুদ্ধের পর যেদিন প্রথম সিরতে ফিরে গিয়েছিলাম, শহরের ধ্বংসস্তুপ দেখে নিথর দাঁড়িয়েছিলাম, সেদিনের দৃশ্য।

লি বাইরুত গানটা বৈরুতকে নিয়ে লেখা। লেবাননের রাজধানী বৈরুত। দেড় দশকের সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধের সময় যে শহরটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল, ইস্ট বৈরুত এবং ওয়েস্ট বৈরুতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। পূর্ব অংশ ছিল খ্রিস্টানদের দখলে, পশ্চিম অংশ ছিল মুসলমানদের দখলে।

বৈরুতের প্রায় সব লেবানিজ শিল্পী-সাহিত্যিকই সে সময় লেবানন ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন পশ্চিমা দেশগুলোতে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন ফাইরুজ। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে তিনি কোথাও যাননি। এবং নিজে খ্রিস্টান হওয়া সত্ত্বেও গৃহযুদ্ধে তিনি খ্রিস্টানদের পক্ষে কোনো গান গাননি, ১৫ বছর পর্যন্ত কোনো কনসার্ট করেননি।

লেবানিজ কবি জোসেফ হার্ব-এর এই কবিতাটিকে ফাইরুজ গান হিসেবে গেয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে। এটা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বৈরুতের প্রতি তার ভালোবাসারই নিদর্শন, তার স্মৃতিকাতরতার বহিঃপ্রকাশ। যুদ্ধ শেষে ১৯৯৪ সালে যখন তিনি বৈরুতের মার্টায়ার্স স্কয়ারে প্রথমবারের মতো কনসার্টে যোগ দেন, তখন তিনি তার অনুষ্ঠান শুরু করেন এই গানটি দিয়ে।

গানটার বাংলা অনুবাদের চেষ্টা করলাম। খুব একটা ভালো হয়নি। কিছু কিছু উপমা নিজের কাছেও পরিষ্কার হয়নি। কিছু বিষয়ের রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বুঝিনি। তারপরেও চেষ্টা করলাম।

লি বাইরুত (বৈরুতের জন্য)
ফাইরুজ

বৈরুতের জন্য …
হৃদয়ের গভীর থেকে সালাম বৈরুতের জন্য
আর চুম্বন তার সমুদ্র আর বাড়িগুলোর জন্য
আর সেই পাথরের জন্য, যা দেখতে
এক বৃদ্ধ নাবিকের চেহারার মতো …

সে ছিল …
মানুষের আত্মা দিয়ে সুরার মতো, সে ছিল …
তাদের ঘামে তৈরি রুটি আর জেসমিনের মতো
এরপর কীভাবে তার স্বাদ হয়ে গেল
আগুন আর ধোঁয়ার স্বাদের মতো?

বৈরুতের জন্য …
বৈরুতের গৌরব তার ছাই দিয়ে তৈরি
তৈরি এক বালকের রক্ত দিয়ে
যাকে সে ধরে রেখেছিল তার হাতের উপর …
আমার শহর তার সব বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল
তার দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল
একাকী হয়ে পড়েছিল রাত্রিবেলা
একাকী, রাজনীতে …

বৈরুতের জন্য …
হৃদয়ের গভীর থেকে সালাম বৈরুতের জন্য
আর চুম্বন তার সমুদ্র আর বাড়িগুলোর জন্য
আর সেই পাথরের জন্য, যা দেখতে
এক বৃদ্ধ নাবিকের চেহারার মতো …

তুমি আমার … তুমি আমার!
আহ, আমাকে আলিঙ্গন কর তুমি!
তুমি আমার নিশান, আগামীর পাথর,
ছুটে চলা তরঙ্গ!
আমার দেশের মানুষের ক্ষত ফুটে উঠেছে,
ফুটে উঠেছে তাদের মায়েদের চোখের পানি,
তুমি আমার বৈরুত, তুমি আমার!
আহ, আমাকে আলিঙ্গন কর!

আরো পড়ুন: আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে আমার সকল লেখা এবং আমার সকল মুভি রিভিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published.