বেস্ট সেলার বই
বই রিভিউ,  বিবিধ

বেস্ট সেলার লিস্টের ভাঁওতাবাজি (আপডেটেড)

বইমেলার সাথে সাথে আবারও শুরু হয়েছে বেস্ট সেলার নিয়ে মাতামাতি। এটা প্রতিবারই ঘটে। কিন্তু আপনি কি জানেন, বেস্ট সেলার লিস্ট জিনিসটা ঠিক কীভাবে কাজ করে?

কেউ যদি বলে তার একটা বই রকমারি বেস্ট সেলার হয়েছে, তার মানে কি সেটা দেশের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের মধ্যে একটা? অথবা কোনো বই যদি ‘অ্যামাজন বেস্ট সেলার’ বা ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার’ তালিকায় স্থান করে নিতে পারে, তার মানে কি সেটা সারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের মধ্যে একটা?

হতেই পারে। কিন্তু বাস্তবে না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

রকমারির কথায় পরে আসছি। প্রথমে নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার লিস্টের কথাই ধরুন। এই লিস্টকে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাবান লিস্টগুলোর মধ্যে একটা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এরকম ঘটনা প্রচুর ঘটে, যেখানে একটা বই ১ লাখ কপি বিক্রি হওয়ার পরেও এই লিস্টে স্থান পায় না, অন্যদিকে অন্য একটা বই ৫ বা ১০ হাজার কপি বিক্রি হয়েও লিস্টে উঠে যায়।

কেন এরকম ঘটে? অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, টাইমস প্রকৃত সোল্ড কপির সংখ্যা হিসেব করে না। ইনফ্যাক্ট বিশ্বের কোনো লিস্ট প্রণেতাই করে না। জ্বী, ঠিকই পড়ছেন। বিশ্বের অধিকাংশ বেস্ট সেলার লিস্টই মূলত এক ধরনের সীমিত জরিপ (অনলাইন বুক শপগুলোর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে)। আর কিছু কিছু লিস্টের অবস্থা আরো খারাপ। সেগুলো নির্মাতাদের মনগড়া।

স্পাই স্টোরিজ: এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনী

সত্যিকারের গুপ্তচরদের কাহিনী নিয়ে লেখা আমার নন-ফিকশন থ্রিলার বই। প্রকাশিত হয়েছে স্বরে অ প্রকাশনী থেকে। ঘরে বসে অর্ডার করতে পারেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে। মুদ্রিত মূল্য ২৭০ টাকা মাত্র। আর পড়ার পর রেটিং এবং রিভিউ দিতে পারবেন গুডরিডসের এই লিঙ্কে

নিউ ইয়র্ক টাইমসের কথা বলছিলাম। টাইমসের মেথডোলজি হচ্ছে, তারা দেশব্যাপী কয়েকশ বা কয়েক হাজার খুচরা বিক্রেতা থেকে সপ্তাহ শেষে রিপোর্ট নেয় কোন বই কত কপি বিক্রি হয়েছে। এরপর বিভিন্ন অঙ্ক-টঙ্ক করে একটা লিস্ট তৈরি করে। অর্থাৎ এটা একটা বাজার জরিপ ছাড়া আর কিছুই না। তবে বেশ প্রশংসিত জরিপ নিঃসন্দেহে।

এই পদ্ধতির কারণে আপনি যদি নতুন লেখক হন এবং আপনার বই নির্দিষ্ট একটা এলাকার অল্প কিছু দোকান থেকে লাখ কপিও বিক্রি হয়ে যায়, তাহলেও হয়তো সেটা টাইমসের রাডারে ধরা পড়বে না। ভাগ্যক্রমে আপনার বই যদি টাইমসের সাথে চুক্তিবদ্ধ দোকানগুলো (এটা সিক্রেট) থেকে বিক্রি হয়, তবেই আপনি গণনার মধ্যে পড়বেন।

দ্বিতীয়ত, টাইমস সব বিক্রয়কেন্দ্রকে একভাবে বিবেচনা করে না। কিছু কিছু বিক্রয়কেন্দ্রকে তারা বেশি ওয়েট দিয়ে হিসেব করে। অ্যামাজন জাতীয় অনলাইন বিক্রয়মাধ্যমকে তারা কম ওয়েট দেয়। ফলে আপনার বই যদি দেশব্যাপী বিভিন্ন দোকান থেকে খুচরাভাবে বিক্রি না হয়ে অনলাইন শপের মাধ্যমে বিক্রি হয়, তাহলে বেশি বই বিক্রি হলেও সেটার নাম উপরের দিকে আসবে না।

তৃতীয়ত, টাইমস প্রতি সপ্তাহে বেশ কিছু ক্যাটাগরির উপর ভিত্তি করে বেস্ট সেলার লিস্ট প্রকাশ করে। এখন আপনি যদি ভালো মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্টকে হায়ার করে বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই বেশ হাইপ তুলতে পারেন, এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ সেল করতে পারেন, তাহলেই কেল্লা ফতে।

বই রিভিউ, পাঠ পর্যালোচনা, বই থেকে নেওয়া বিভিন্ন আর্টিকেল সংক্রান্ত আমার সকল লেখা পড়ুন এই পাতা থেকে।

ধরুন আপনি নতুন লেখক এবং প্রথম বইয়েই এমনভাবে হাইপ তুলতে পারলেন যে, প্রথম সপ্তাহেই আপনার বই ৫,০০০ কপি বিক্রি হয়ে গেল। ফলে আপনি ঐ ক্যাটাগরির বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়ে গেলেন। কিন্তু আপনার বইটি আসলে খুব ভালো ছিল না। ফলে পড়ার পর মানুষের নেগেটিভ রিভিউর কারণে আপনার বইয়ের বিক্রি ড্রামাটিক্যালি কমে গেল।

অন্যদিকে আরেকজন লেখক, যার আগে থেকেই মোটামুটি পরিচিতি আছে, তার বই বের হওয়ার পর প্রতিমাসেই ৪,৫০০ কপি করে বিক্রি হতে লাগলো। বছর শেষে দেখা গেল, তার বই মোট বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার কপি, কিন্তু তারপরেও তিনি কোনো সপ্তাহের বেস্ট সেলার লিস্টেই স্থান পাননি। অথচ আপনার বই পুরো বছরে মাত্র ৭,০০০ কপি বিক্রি হয়েও আপনি হয়ে গেলেন প্রেস্টিজিয়াস “নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার অথর” 🙂

চতুর্থত, অন্য সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও বেস্ট সেলার লিস্ট নিয়ে পর্দার আড়ালে দুর্নীতিও চলতে পারে। টাকা-পয়সার লেনদেন যদি নাও হয়, লিস্ট প্রণেতারা নিজস্ব নীতি অনুযায়ীও কোনো বইকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন, অন্য কোনো বইকে লিস্ট থেকে বের করে দিতে পারেন। এই উদাহরণ বাংলাদেশেও বেশ প্রকট। কাশেম বিন আবুবাকারের বই প্রচুর বিক্রি হওয়ার পরেও দেশের নামকরা পত্রিকাগুলো সেটা নিয়ে আলোচনা করে না।

সবচেয়ে ভালো উদাহরণটা ঘটেছিল উইলিয়াম ব্ল্যাটির উপন্যাস ‘দ্য এক্সরসিস্টের ক্ষেত্রে’। বইটা প্রচণ্ড রকমের জনপ্রিয় ছিল, লাখ লাখ কপি বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু তারপরেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত এটা নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পায়নি। ক্ষুব্ধ লেখক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি হেরে গিয়েছিলেন।

কেন? কারণ টাইমসের যুক্তি ছিল, তারা কখনোই দাবি করেনি যে, তাদের লিস্টটা অ্যাকচুয়াল মার্কেটকে রিপ্রেজেন্ট করে 🙂 কাজেই তাদের লিস্টের মধ্য দিয়ে শুধু প্রকৃত সোল্ড কপির পরিমাণ না, তাদের সম্পাদকীয় নীতিও প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ কোনো বইকে তারা অনুপযুক্ত মনে করলে সেটাকে লিস্টে নিচের দিকে পাঠিয়ে দিতে পারে। এটা তাদের স্বাধীনতা 🙂

আমার স্পাই স্টোরিজ বইয়ের একটি অংশ পড়ে দেখুন: বিলিয়ন ডলার স্পাই: স্পাই স্টোরিজ বইয়ের এক্সার্প্ট

পত্রিকাগুলোর বেস্টসেলার লিস্টের তুলনায় অ্যামাজন বা আমাদের দেশের রকমারির বেস্ট সেলার লিস্ট তৈরির মেথডোলজি অনেকক্ষেত্রেই সিম্পল হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও ত্রুটি আছে। যেমন এরা শুধু নিজেদের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া সংখ্যাটাই দেখে, এর বাইরে অন্যান্য অনলাইন বা অফলাইন বুক শপ বা বইমেলা থেকে বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা এদের হিসেবে ধরা পড়ে না।

ধরুন একজন লেখকের বই প্রতিবছরই বইমেলায় বেশ ভালো বিক্রি হয়। তার এবারের বইটিও বেশ প্রশংসিত হলো। একাধিক মুদ্রণে মোট ৪,০০০ কপি বের হলো। অধিকাংশ পাঠকই বইমেলা থেকে তার বই কিনল। এর বাইরে পুরো মাসে ২০০ জন রকমারি থেকে বইটা অর্ডার করল।

অন্যদিকে নতুন একজন লেখকের বই মুদ্রিতই হলো ২০০ কপি। মেলায় সেগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর ফেসবুকে কয়েকটা পৃষ্ঠার স্ক্রিনশটের কারণে সে ভাইরাল হয়ে গেল। যেহেতু নতুন মুদ্রণের আগে মেলায় পাওয়া যাচ্ছে না, হুজুগে পাঠক এক সপ্তাহেই ৩০০ কপি অর্ডার করে বসল। এখন মাস শেষে টোটাল সেলে প্রথম জন অনেক অনেক এগিয়ে থাকলেও রকমারির লিস্টে কিন্তু উপরে উঠে যাবে দ্বিতীয়জন।

এছাড়াও এখানেও হাইপ তুলে এক সপ্তাহে (অ্যামাজনের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টায়) সর্বোচ্চ সেল করে বেস্ট সেলার লিস্টে উঠে যাওয়া সম্ভব। অনেক লেখক-প্রকাশকই এই কাজ করে থাকেন। টাকা-পয়সা খরচ করেও তারা বেস্ট সেলার লিস্টে নিজের নামটা উঠাতে চান। কারণ এতে বিক্রি বৃদ্ধি পায়, ফলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়।

ইমেইলের মাধ্যমে নতুন পোস্টের আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করে 50 জনের সাথে যোগ দিন।

২০০৪ সালের এক জরিপ অনুযায়ী নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেলে তা বইয়ের বিক্রি ১৩-১৪ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। আর নতুন লেখক হলে এই বৃদ্ধি হয় ৫৭% পর্যন্ত। আর সম্মান, নতুন বইয়ের ডিল তো আছেই।

এবার আসা যাক রকমারির বেস্ট সেলার লিস্টের ব্যাপারে। এখানেও বেশ ঝামেলা আছে। যদিও প্রমাণ করা যাবে না, কিন্তু অনেক বিখ্যাত লেখক-প্রকাশকই যে গত কয়েক বছরে নিজেরাই নিজেদের বই ৫০-১০০ কপি অর্ডার করিয়ে রকমারির বেস্ট সেলার তালিকায় নাম উঠিয়েছেন, এটা একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছি।

কিন্তু এরপর রকমারি তাদের অ্যালগরিদমে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। গত বছর এই আর্টিকেলটা প্রথম লেখার আগে রকমারির একজন প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তার দাবি অনুযায়ী, এখন আর এই পদ্ধতিতে বেস্ট সেলার লিস্টে নাম উঠানো যায় না। কারণ এখন একটা আইডি থেকে ১০০ কপি অর্ডার দিলেও বেস্ট সেলার লিস্ট তৈরির সময় রকমারি সেটাকে ১টা অর্ডার হিসেবেই বিবেচনা করে। এখন বেস্ট সেলারে নাম ওঠাতে চাইলে ভিন্ন ভিন্ন আইডি থেকে পৃথক পৃথকভাবে সবগুলো অর্ডার দিতে হবে।

কিন্তু তারপরেও এখনও রকমারির লিস্টে ঝামেলা আছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণটা পেয়েছি আমি নিজেই, গত কয়েকদিন আগে। এই বইমেলায় আমার নিজের একটা নন-ফিকশন এসপিওনাজ থ্রিলার বই বেরুচ্ছে, “স্পাই স্টোরিজ” নামে। বইটার প্রি-অর্ডার লিঙ্ক আসার দুই দিন পর হঠাৎ দেখি রকমারির হোমপেজে “গত সপ্তাহের বেস্টসেলার ২০টি পণ্য” সেকশনে আমার বইটাকে ১৯ নম্বরে শো করছে।

এরপর ভেতরে ঢুকে যখন লিস্টটাকে ফিল্টার করে গত সপ্তাহের শুধুমাত্র “Newly Released” বইগুলো দেখাতে বললাম, তখন আমার চক্ষু পুরাই চড়কগাছ! আমার স্পাই স্টোরিজ বইটাকে সেখানে দেখাচ্ছে ১ নম্বরে। সাদাত হোসাইন এবং আরিফ আজাদের বইয়েরও আগে। এটা কীভাবে সম্ভব?

রকমারির নিউলি রিলিজড সাপ্তাহিক বেস্ট সেলার লিস্টে আমার স্পাই স্টোরিজ ১ নম্বরে

পরবর্তী দুইদিন ভালোভাবে মনিটর করার পর ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হলো। রকমারির ওয়েবসাইটে “গত সপ্তাহের” দাবি করা হলেও বাস্তবে লিস্টটা তারা প্রতিদিন রাত ১২টার (বাংলাদেশ টাইম ভোর ৪টার) দিকে আপডেট করে। ফলে কারো কোনো বই যদি কোনো একদিন অনেক বেশি বিক্রি হয়, তাহলে সে সহজেই সেদিন বেস্ট সেলার তালিকায় ১ নম্বরে উঠে যেতে পারবে।

ধরুন সাদাত হোসাইন এবং আরিফ আজাদের বই প্রথম কয়েক দিন অনেক বেশি বিক্রি হওয়ার পর এখন প্রতিদিনই মোটামুটি ৫০-৬০ কপি করে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আমার বইটা নতুন আসার পর প্রথম দিনই আমার ভক্ত পাঠকরা অতি-আগ্রহী হয়ে একদিনেই ৭০ কপি অর্ডার করে বসল। ফলে সেদিন রাত পোহানোর পর আমার বইটা চলে যাবে ১ নম্বরে। সপ্তাহ শেষে অবশ্য আমার নাম আবার নিচের দিকে নেমে যাবে, কিন্তু একদিনের জন্য যে আমার বইটা ১ নম্বরে উঠেছিল, সেটাই আমি সাড়ম্বরে প্রচার করতে পারব 🙂

রকমারির ক্ষেত্রে অবশ্য দৈনিক বা সাপ্তাহিক বেস্ট সেলার লিস্টের উপর ভরসা না করে “গত বছরের বেস্ট সেলার” লিস্ট ফলো করলে মোটামুটি ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। এছাড়াও এই বইমেলা উপলক্ষ্যে তারা যে বিশেষ বেস্ট সেলার তালিকা প্রকাশ করছে, সেটাও হয়তো টোটাল সেলের ভিত্তিতেই করেছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে লিস্টকে টুইক করা কঠিন কোনো বিষয় না।

সো, আমরা কি বেস্টসেলার লিস্টকে পাত্তা দিব না? সেটা না। বেস্ট সেলার লিস্ট নেড়েচেড়ে দেখা যেতেই পারে। কিন্তু বেস্ট সেলার মানেই দেশের সেরা বই বা সবচেয়ে জনপ্রিয় বই – এরকম ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা ভালো। এখানে অনেক ধরনের ঘাপলা থাকতে পারে। ভালো বইয়ের খোঁজ পাওয়ার জন্য কোন বই কত কপি বিক্রি হচ্ছে, সেটার চেয়ে পছন্দের রিভিউয়াররা বইটি সম্পর্কে কী বলছে, সেটা আরও বেশি কাজে লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *