হামা গণহত্যার নায়ক বাশার আল-আসাদের চাচা রিফাত আল-আসাদ
বিশ্ব রাজনীতি

রিফাত আল-আসাদ এবং তার গণহত্যাগুলো

এই লোকের নাম রিফাত। রিফাত আল-আসাদ।

সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের চাচা। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের ভাই। ২০১১ সালের গৃহযুদ্ধের প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে, সত্তরের দশকের শেষের দিকে যখন সিরিয়াতে প্রথম গৃহযুদ্ধ চলছিল, তখন রিফাত আল-আসাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছিল একাধিক গণহত্যা।

ঐ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত লেবাননে সিরিয়ান সৈন্য প্রেরণকে কেন্দ্র করে। হাফেজ আল-আসাদ যখন লেবাননে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানকার গৃহযুদ্ধে খ্রিস্টানদের পক্ষে গিয়ে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন, তখন সিরিয়ার ইসলামপন্থী দলগুলো হাফেজের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেয়।

সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে সেনাবাহিনীর সাথে ইসলামপন্থী গেরিলাদের খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বাথ পার্টির কর্মকর্তারা এবং আলাউই বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একের পর এক গুপ্ত হত্যার শিকার হতে থাকেন। তবে সেনাবাহিনীর পাল্টা অভিযানে নির্বিচারে নিহত হতে থাকে আরো অনেক বেশি সংখ্যক গেরিলা এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি।

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামেন হাফেজের ভাই মেজর জেনারেল রিফাত আল-আসাদ। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন, স্ট্যালিন তার বলশেভিক বিপ্লবকে রক্ষার জন্য যেরকম ১ কোটি মানুষকে হত্যা করেছিল, তিনিও তার দেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনে একশটি যুদ্ধে লড়বেন, শত্রুপক্ষের ১০ লাখ ঘাঁটি ধ্বংস করবেন, নিজেদের ১০ লাখ শহিদের জীবন বিলিয়ে দিবেন।

তার এ ভাষণের কয়দিন পরেই জিসর আশ্‌-শুগুরে যখন ইসলামপন্থীরা সেনাবাহিনীর ব্যারাকে আক্রমণ করে ৯৭ জন সেনাসদস্যকে হত্যা করে, রিফাত তখন সেখানে হেলিকপ্টারে করে সৈন্য পাঠিয়ে ২০০ জনকে হত্যা করেন। তার কিছুদিন পর আলেপ্পোতে বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাঠান ১০ হাজার সৈন্য এবং ২৫০টি সাঁজোয়া যান।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে আমার সবগুলো লেখা পড়ুন এখান থেকে

১৯৮০ সালের ২৬ জুন নিজ প্রাসাদের সামনে হাফেজ আল-আসাদের উপর গ্রেনেড হামলা হয়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান হাফেজ। নিজেদের উপর আঘাত আসায় আসাদ পরিবারের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ। হাফেজের ভাই রিফাত প্রথমে দামেস্ককে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

কিন্তু কিছুটা সামলে নিয়ে তিনি তার দৃষ্টি ফেরান দামেস্ক থেকে দুইশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন শহর পালমিরার দিকে। সেখানে মরুভূমির বুকে অবস্থিত কুখ্যাত তাদমুর জেলখানায় রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বন্দী ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের কয়েক হাজার নেতাকর্মী।

সেদিন রাত রাত তিনটার সময় রিফাতের নির্দেশে তার অধীনস্থ ডিফেন্স কোম্পানির দুইটি ব্রিগেডের সদস্যদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়। রিফাতের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ডিফেন্স কোম্পানির একটি ব্রিগেডের প্রধান, মেজর মঈন নাসিফের নেতৃত্বে তাদেরকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় পালমিরাতে।

ভোর সাড়ে ছয়টার সময় ছয়টি স্কোয়াডে বিভক্ত হয়ে জেলখানায় প্রবেশ করে ডিফেন্স কোম্পানির ৬০ জন সদস্য। এর পরের আধ ঘণ্টা জেলখানার ভেতরে মেশিনগানের গুলি, গ্রেনেড বিস্ফোরণের মুহূর্মুহ আওয়াজ, আর মৃত্যুর পূর্বে বন্দীদের মুখের আল্লাহু আকবার ধ্বনি ছাড়া অন্য কোনো শব্দ ছিল না।

১৯৮০ সালের ২৭ জুনের সেই ভোরে মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই রিফাতের বাহিনীর হাতে নির্বিচার গণহত্যার শিকার হয় ৫০০ থেকে ১০০০ বন্দী, যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিহতদের রক্ত এবং গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ পরিষ্কার করতে জেলখানার কর্মীদের সময় লেগেছিল দুই সপ্তাহ।

পরবর্তীতে হামা ম্যাসাকারেও রিফাত আল-আসাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স কোম্পানির ১২,০০০ সৈন্য হামায় ১০ থেকে ২০ হাজারের মতো মানুষের উপর গণহত্যা চালায়।

বলাই বাহুল্য, রিফাতের কোনোদিন বিচার হয়নি। রিফাতদের সাধারণত বিচার হয় না। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে হাফেজের অসুস্থতার সময় তিনি একবার ক্যু করার চেষ্টা করেছিলেন, সেই অপরাধে হাফেজ তাকে ফ্রান্সে নির্বাসনে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি মোটামুটি ইউরোপেই আছেন, যদিও কয়েকবার দেশেও ফিরে গিয়েছিলেন।

গতকাল ফ্রান্সের একটা আদালত ৮২ বছর বয়সী রিফাত আল-আসাদকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। নাহ, গণহত্যার জন্য না। মানি লন্ডারিংয়ের জন্য।

তথ্যসূত্র:
Asad: The Struggle for the Middle East by Patrick Seale
Under the Black Flag: At the Frontier of the New Jihad by Sami Moubayed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *