মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানির মৃত্যুতে ইসলামপন্থীদের শিয়া-সুন্নি বিষয়ক বিতর্ক
বিশ্ব রাজনীতি

কাসেম সোলায়মানির মৃত্যুতে ইসলামপন্থীদের শিয়া-সুন্নি বিষয়ক প্রতিক্রিয়া

কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা বা আঘাত করা হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী রকম হওয়া উচিত, সেটা নিয়ে ইন্টারেস্টিং একটা ক্যাচাল বেঁধেছিল বছর দেড়েক আগে। ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার , মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানির মৃত্যুর পর সেটা আবার মনে পড়ে গেল।

মাহমুদুর রহমানকে ছাত্রলীগ/যুবলীগের সোনার ছেলেরা পেটানোর পর এমন অনেকেই তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছিল, যারা আদর্শিকভাবে মাহমুদুর রহমানের সাথে অনেক বিষয়েই একমত না। সুতরাং তাদের প্রতিবাদের ভাষা ছিল মোটামুটি এরকম – “মাহমুদুর রহমানের সাথে আমি অনেক ব্যাপারেই একমত না, কিন্তু আজকে যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না।”

আমার মতে নিন্দা জানানোর এটা খুবই সুন্দর একটা পদ্ধতি। সবার সাথে আমি স্বাভাবিকভাবেই একমত হব না, কিন্তু তাদের উপর জুলুমের বিরোধিতা আমার অবশ্যই করা উচিত। এরকম ক্ষেত্রে একটা ডিসক্লেইমার দিয়ে পরিষ্কার করে নিলে সবার বুঝতে সুবিধা হয় যে, আমি অন্যায়টারই প্রতিবাদ করছি, কিন্তু তাই বলে আক্রান্ত ব্যক্তির আদর্শের অনুসারী হয়ে যাইনি। তাছাড়া এতে তার উপর জুলুমের মাত্রাটাও প্রকাশ পায় যে, সম্পূর্ণ ভিন্নমতের মানুষরাও তার উপর চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে।

কিন্তু আমার ফ্রেন্ডলিস্টের একটা বড় অংশই তখন এভাবে নিন্দা প্রকাশের কঠোর বিরোধিতা করেছিল। বেশ আক্রমণাত্মক ভাষাতেই তাদের অনেকে সেদিন স্ট্যাটাস দিয়েছিল, আজকের দিনে মাহমুদুর রহমান নির্যাতিত, তার উপর জুলুম করা হয়েছে – এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। এই সংকটময় মুহূর্তেও কেন তার সাথে ভিন্নমতের কথা ডিসক্লেইমার দিয়ে বলে দিতে হবে? কেন নিঃশর্ত নিন্দা প্রকাশ করা যাবে না?

আরো পড়ুন: ইরান ক্যাবল: ইরাকে ইরানি গোয়েন্দাদের গোপন কার্যক্রমের তথ্য

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেদিন যারা জুলুমের বিরুদ্ধে এই নিঃশর্ত নিন্দার সবচেয়ে বড় পক্ষপাতী ছিল, কাসেম সোলায়মানিকে আমেরিকা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে, কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করার পরেও তাদের অনেকে নিঃশর্ত বা শর্তযুক্ত – কোনো ধরনের নিন্দার ধার না ধেরে উল্টো সোলায়মানির সব অন্যায় কাজকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরছে।

এবং এদের মধ্যে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত ভাইদের সংখ্যাই বেশি। অথচ পশ্চিমা নাস্তিক সাংবাদিকরা সোলায়মানির খারাপ কাজগুলোর সমালোচনাও করছে, সেনাপতি হিসেবে তার দক্ষতার প্রশংসাও করছে, আবার আমেরিকার এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতাও করছে, এর বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছে।

এখন অনেকেই বলবে, কোথায় মাহমুদুর রহমান, আর কোথায় কাসেম সোলায়মানি? জ্বী, ভালো-খারাপ কোনো দিকেই মাহমুদুর রহমান সোলায়মানির আশেপাশে নাই। কিন্তু এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। একেকজনের ক্ষেত্রে আপনি একেক নীতি অনুসরণ করবেন, এটা তো হওয়া উচিত না!

আরো পড়ুন: ইরান ক্যাবল ৪র্থ পর্ব: ইরাকে কাসেম সোলায়মানির সুন্নিবিরোধী কঠোর নীতি

কিছু “ইসলামিক” পোর্টালকেও দেখলাম সুন্নিদের উপর চালানো সোলায়মানির হত্যাকাণ্ড নিয়ে, ইদলিবে মিষ্টি বিতরণ নিয়ে একের পর এক নিউজ করে যাচ্ছে। অথচ এটা একটা মাত্র চিত্র। বিপরীতদিকে সোলায়মানির নেতৃত্বে যে ইরান কিছু এলাকায় আইএসবিরোধী যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, সোলায়মানি যে দীর্ঘদিন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদেরকে সাহায্য করেছে, এবং সেজন্য হামাস এবং প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদ উভয়েই যে সোলায়মানির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছে, সোলায়মানির জানাজায় যে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টিকারী জনসমাগম হয়েছে, এসব নিউজ তাদের পোর্টালে পুরাই অনুপস্থিত। কী সততা এবং নিরপেক্ষতা!

ইদলিবে মিষ্টি বিতরণের নিউজটা বেশ ছড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে জড়িত যেকোনো নেতার মৃত্যুতেই তার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে মিষ্টি বিতরণ স্বাভাবিক। সিরিয়ার অনেক শহরে সোলায়মানির সহযোগিতায় বাশার আল-আসাদ ম্যাসাকার চালিয়েছে। সুতরাং তারা মিষ্টি বিতরণ করবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।

গাদ্দাফি-সাদ্দামের পতনের পর মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল কিনা, মনে পড়ছে না, কিন্তু উল্লাস হয়েছিল ঠিকই। এবং ধারণা করা যায়, আজ এরদোয়ান মারা গেলে কাল হয়তো অনেক কুর্দিও মিষ্টি বিতরণ করবে। যারা কমেন্টে কমেন্টে গিয়ে মিষ্টি বিতরণের সংবাদ শেয়ার করছেন, তারা কি সব মিষ্টি বিতরণের সংবাদ একইভাবে শেয়ার করতে আগ্রহী আছেন?

সোলায়মানির হাতে প্রচুর সুন্নিদের রক্ত আছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু এর কতটা সুন্নিদের প্রতি তার বিদ্বেষের কারণে, সেটা আমাদের জানা নাই। আমাদের যেটা জানা আছে, সেটা হচ্ছে, মার্কিন মিত্রদের দ্বারা চার পাশ থেকে ঘেরাও থাকা অবস্থায় সোলায়মানির পক্ষে সিরিয়া এবং ইরাককে হাতছাড়া করার ঝুঁকি নেওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না।

ইমেইলের মাধ্যমে নতুন পোস্টের আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করে 22 জনের সাথে যোগ দিন।
কী ধরনের আপডেট চান?

সোলায়মানি যা করেছে, নিজের দেশকে রক্ষা করার জন্য করেছে। হ্যাঁ, সে কারণে অবশ্যই তার অন্যায়গুলো মাফ হয়ে যায় না। কিন্তু এসব ব্যাপারে আলোচনা করার সময় অন্যান্য সুন্নি নেতাদের হাতে নিহতদের কথাও মাথায় রাখতে হবে।

সৌদি-ইমারাত-মিসরের হাতে কত সুন্নি মারা গেছে এবং যাচ্ছে? পাকিস্তানের হাতে কত লাখ সুন্নি মারা গিয়েছিল? আপনার কি ধারণা এরাও কি সুন্নিবিদ্বেষের কারণেই এতো মানুষকে হত্যা করেছে? নাকি শিয়া-সুন্নির বাইরেও দুনিয়াতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থ নামে কোনো জিনিস আছে?

সৌদি-ইমারাতের ব্যাপারে আমাদের যতটুকু সমালোচনা, সোলায়মানির ব্যাপারে আমাদের সমালোচনা যদি বেশি হয় শুধুমাত্র এই কারণে যে, সোলায়মানি শিয়া, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের মারা খাওয়ার দিন এখনও অনেক বাকি আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.