ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মো'আবিয়া (রা)
ইসলামিক,  বই রিভিউ

ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মো’আবিয়া (রা): অভিযোগের জবাব

ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মো’আবিয়া (রা) বইটির লেখক বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, মুফতি তকী উসমানী। বইটির নাম এবং প্রশংসা শুনেছিলাম, কিন্তু বিষয়বস্তু বিস্তারিত জানতাম না। ভেবেছিলাম হযরত মুয়াবিয়ার (রা) জীবনী। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সেরকম না।

বইটিকে দুই অংশে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশ হচ্ছে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সমালোচনার জবাব। এবং দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে মুয়াবিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন সাহাবিদের উক্তির সঙ্কলন, সেই সাথে মুয়াবিয়ার অতি সংক্ষিপ্ত জীবনী – মূলত শাসনকাল।

প্রথম অংশে যে সমালোচনার জবাব, তার পুরোটাই মূলত জামায়াতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীর সমালোচনার জবাব। বলা যায় বইটা লেখাই হয়েছে মূলত মওদুদীর “খিলাফত ও রাজতন্ত্র” বইয়ে উত্থাপিত বক্তব্যকে খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে।

লেখক অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে, মূল টেক্সট রেফারেন্স কোট করে করে প্রমাণ করেছেন, মুয়াবিয়া সম্পর্কে মওদুদী যেসব অভিযোগ করেছেন, তার সবই ভুল। মওদুদী কখনও সুন্নি স্কলারদের এড়িয়ে গিয়ে শিয়া স্কলারদের রেফারেন্স দিয়েছেন, কখনও একেবারেই দুর্বল সনদ ব্যবহার করেছেন, এবং কখনও মূল রেফারেন্সের আগেপিছের অংশ কাটছাট করে চেরিপিক করেছেন, এমনকি শব্দের অর্থও ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রতিটি ক্ষেত্রে তকী উসমানী প্রথমে মওদুদীর বই থেকে সরাসরি কোট করেছেন, এরপর মওদুদী যেসব রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন, সেসব রেফারেন্স সরাসরি কোট করে তুলনা করে এমনভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, পাঠক কনভিন্সড হতে বাধ্য। কিন্তু যেসব ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে কিছু প্রমাণ করা যায়নি, সেসব ব্যাপারে তিনি মুয়াবিয়াকে বেনিফিট অব ডাউট দিয়েছেন এই আক্বীদাগত কারণে যে, তিনি একজন মর্যাদাপূর্ণ সাহাবী।

অন্যদিকে তার সমালোচনা থেকে যা মনে হয়, মওদুদী হয়তো স্কলার হিসেবে নিম্নমানের, অথবা তিনি আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুয়াবিয়ার প্রচুর দোষ আছে, এরপর সেগুলো খুঁজে বের করে লিখেছেন। অথচ মওদুদী নিজেও বিখ্যাত আলেম হিসেবে সুপরিচিত। বইয়ের আরেকটি ত্রুটি হচ্ছে, এখানে এমনকি ইয়াজিদকে মনোনীত করার ব্যাপারেও মুয়াবিয়ার অতিরিক্ত পুত্রস্নেহের ব্যাপারটি অস্বীকার করে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে।

বইয়ের ব্যাপারে এরচেয়ে বেশি মন্তব্য করা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে সম্ভব না, তবে অনুবাদের ব্যাপারে একটা কথা বলা দরকার। অনুবাদক নিজেই ভূমিকায় স্বীকার করেছেন, তকী উসমানীর মূল বইয়ের ভাষাশৈলী ছিল “জ্ঞানগম্ভীর ও শান্ত-সুশীল”, পক্ষান্তরে অনুবাদের ভাষাশৈলী কিছুটা “তর্কমুখী ও অম্লমধুর”। কিন্তু আমার যেটা মনে হয়েছে, এরফলে পাঠকের মনে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

যেমন বইয়ে প্রতি কয়েক অনুচ্ছেদ পরপর মওদুদীর বক্তব্যকে খণ্ডন করতে গিয়ে যেভাবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য কী ছিল এরকম প্রশ্ন করা হয়েছে, তার নামের সাথের বিভিন্ন বিশেষণ, যেমন ভদ্রলোক, মাওলানা, প্রভৃতি কোটেশনের ভেতর উল্লেখ করা হয়েছে, তার কতটুকু তকী উসমানী নিজে করেছেন, আর কতটুকু অনুবাদক আবু তাহের মিসবাহ সংযোজন করেছেন, এই সন্দেহটা শেষপর্যন্ত রয়েই গেছে।

যদিও আমি পূর্ণাঙ্গ জীবনী জাতীয় কিছু ভেবেই পড়েছিলাম, কিন্তু তারপরেও সব মিলিয়ে বইটা ভালো লেগেছে। রেটিং ৪/৫ দিলাম। অন্তত মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে কমন অভিযোগগুলোর ব্যাপারে পরিষ্কার হওয়া গেল। তবে ফেসবুকে স্ট্যাটাসটি শেয়ার করার পর পাঠকদের মন্তব্য থেকে জানা গেল, এই বইটির যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেও পাল্টা একটি বই লিখেছেন। সেটিও লিখেছেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের আরেক বিচারপতি মালিক গোলাম আলি। বইটির নাম “খেলাফত ও রাজতন্ত্র গ্রন্থের ওপর অভিযোগের পর্যালোচনা”।

আমার লেখা সবগুলো বই-রিভিউ পড়তে ক্লিক করুন এখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *