আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে জোহরা দ্রিফের আত্মজীবনী ইনসাইড দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স বইয়ের কভার
বই রিভিউ,  বিশ্ব রাজনীতি

ইনসাইড দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স: দুঃসাহসী নারী গেরিলা জোহরা দ্রিফ এর আত্মজীবনী

ঔপনিবেশিক ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিশেষ করে এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের যুদ্ধের উপর নির্মিত দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স (The Battle of Algiers) সিনেমাটা হয়তো অনেকেই দেখেছেন। ঐ সিনেমায় যে তিন নারী গেরিলাকে দেখানো হয়েছিল, জোহরা দ্রিফ (Zohra Drif) ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। ইনসাইড দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স (Inside the Battle of Algiers: Memoir of a Woman Freedom Fighter) নামের এই বইটা তারই আত্মজীবনী।

বইটার ভূমিকা লিখেছেন বিখ্যাত কূটনীতিক লাখদার ব্রাহিমি, যিনি আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ পূর্বকালীন সময়ে ভার্সিটিতে জোহরার সহপাঠী ছিলেন। লাখদার ব্রাহিমি ছিলেন এক সময় আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালে সিরিয়ার যুদ্ধের সময় সিরিয়ায় নিযুক্ত জাতিসংঘের এবং আরব লীগের বিশেষ দূত। বইটার ইংরেজি অনুবাদ করেছেন Farrand G. Andrew।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে নারী গেরিলা জোহরা দ্রিফের আত্মজীবনী ইনসাইড দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স বইয়ের কভার
আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে জোহরা দ্রিফের আত্মজীবনী ইনসাইড দ্য ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স বইয়ের প্রচ্ছদ

বইটাকে ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স সিনেমার এক্সটেন্ডেড ভার্সন বলা যেতে পারে। এখানে জোহরা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন তার ফ্রেঞ্চ স্কুলে বেড়ে ওঠার কথা, ছোটবেলা থেকেই ঔপনিবেশিক ফরাসিদের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার কথা, ভার্সিটিতে থাকা কালে ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার কথা।

সহপাঠী সামিয়া লাখদারির সাথে মিলে নিজেদের উদ্যোগেই কীভাবে তারা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামী সংগঠন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট, এফএলএনের (FLN – National Liberation Front) সদস্যদেরকে খুঁজে বের করে দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন, কীভাবে নিজেরাই ইউরোপিয়ান কলোনিতে বোমা নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং কীভাবে পরে তা বাস্তবায়িত করেছিলেন – প্রভৃতি ঘটনা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে বইটাতে।

বইটাতে সমানভাবে উঠে এসেছে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে জোহরা দ্রিফের সহযোদ্ধাদের কথা, বিশেষ করে তার নারী সহযোদ্ধাদের কথা, এফএলএনের নেতাদের কথা – আলজিয়ার্স অটোনমাস জোনের কমান্ডার (এবং ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স মুভির মূল অভিনেতা ও প্রযোজক) সাদি ইয়াসেফের কথা, জোহরা যাকে পুরো বইতে এল-খু তথা ভাই হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উঠে এসেছে তাদের সহযোদ্ধা আলি লাপয়েন্টের কথা, যার প্রতি জোহরার শ্রদ্ধা লক্ষণীয়।

উঠে এসেছে এফএলএনের অন্যতম প্রধান নেতা আল-আরাবি বেন-এমহেইদির কথা, সহযোদ্ধা এবং দুঃসাহসী নারী গেরিলা জামিলা বুহাইরেদ, সামিয়া লাখদারি এবং হাসিবা বেন বুআলির কথা। এদের সাথে মিলে ফরাসিদের বিরুদ্ধে জোহরার দুঃসাহসী অপারেশনগুলো এবং আলজিয়ার্সের পুরাতন দুর্গ নগরী কাসবার অলিগলির ভেতরে তাদের আত্মগোপনের দিনগুলোর কথা বিস্তারিত উঠে এসেছে বইয়ে। বইয়ের কিছু কিছু ঘটনার বর্ণনা এতোই শ্বাসরুদ্ধকর যে, সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মনে হয় যেন থ্রিলার উপন্যাসের পাতা থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও বাস্তবে প্রতিটা ঘটনাই ঐতিহাসিক সত্য।

আলজেরিয়ার যুদ্ধের বিখ্যাত নারী গেরিলা জোহরা দ্রিফ, ফরাসি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সময়
আলজেরিয়ার যুদ্ধের বিখ্যাত নারী গেরিলা জোহরা দ্রিফ, ফরাসি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সময়

তবে ৩২০ পৃষ্ঠার বইটাকে পাঠকের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড় বলে মনে হতে পারে। ঘটনাগুলোকে একটানা বর্ণনা না করে ভেতরে ভেতরে নিজের অনুভূতি, নিজের চিন্তাভাবনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার ভঙ্গিও অনেকের কাছে কিছুটা ধীরগতির এবং বিরক্তিকর বলে মনে হতে পারে। ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স মুভিটা দেখা না থাকলে, বা আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের ভূমিকার কথা একেবারেই না জানা থাকলে অবশ্য বইটা আরও বেশি ভালো লাগতে পারে।

ব্যক্তিগত রেটিং ৩/৫। সিনেমার সাথে তুলনা করলে ব্যাটেল অফ আলজিয়ার্স সিনেমাটা এর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল, যদিও সেখানে বইয়ের ক্ষুদ্র একটা অংশই দেখানো হয়েছিল কেবল।

জোহরা দ্রিফের সহযোদ্ধা জামিলা বুহাইরেদকে তার দুঃসাহসিকতা এবং অনমনীয়তার জন্য বলা হয় আরবের জোয়ান অফ আর্ক। তার গেরিলাযুদ্ধের কাহিনী নিয়ে “জামিলা বুহের্দ: আরবের জোয়ান অব আর্ক” শিরোনামে রোর বাংলায় আমার একটা লেখা আছে, পড়ে দেখতে পারেন এখান থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published.