১৭ই ফেব্রুয়ারির বিপ্লব, লিবিয়ান বিদ্রোহীদের এবং ন্যাটোর হাতে গাদ্দাফির পতনের ইতিহাস
Featured,  বিশ্ব রাজনীতি,  লিবিয়ার রাজনীতি

১৭ই ফেব্রুয়ারির বিপ্লব: গাদ্দাফীর পতনের জানা-অজানা ‌অধ‍্যায়

২০১১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি। আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় সেদিন লিবিয়াতেও শুরু হয়েছিল গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, যার ধারাবাহিকতায় আট মাস পর ঘটেছিল বেয়াল্লিশ ধরে ক্ষমতায় থাকা লৌহ মানব গাদ্দাফির পতন। কিন্তু ঠিক কী কারণে, কীভাবে শুরু হয়েছিল এ বিদ্রোহ? আর ঠিক কীভাবেই পতন হয়েছিল গাদ্দাফীর? সেই ইতিহাসই তুলে ধরলাম এ লেখায়। লেখাটি মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

এক. বিদ্রোহের পটভূমি

ঘটনার শুরু ১৯৯৬ সালে। আফগানিস্তান ফেরত তিন লিবিয়ান যোদ্ধার স্থান হয় ত্রিপলীর আবু সেলিম কারাগারে। সে সময় ঐ কারাগারে প্রায় ১৭০০ বন্দী ছিল, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল হয় আফগানিস্তানে আল ক্বায়েদা এবং অন্যান্য জিহাদী সংগঠনের হয়ে যুদ্ধ করার, অথবা গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার। কারাগারে খাবারের করুণ অবস্থা, বন্দীদের উপর গার্ডদের কঠোর নির্যাতন এবং বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর আটকে রাখার সংস্কৃতি অনুধাবন করতে পেরে ঐ তিন যোদ্ধা সিদ্ধান্ত নেয়, যে করেই হোক তাদেরকে সেখান থেকে পালাতে হবে।

তাদেরকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় না। জুন মাসের ২৮ তারিখেই তারা সুযোগ পেয়ে যায়। সেদিন বিকেলে তারা অসতর্ক অবস্থায় থাকা এক গার্ডকে আটকে ফেলে এবং তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে সবগুলো সেলের দরজা খুলে দিতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই শতশত বন্দী তাদের সেল থেকে বেরিয়ে আসে। ছাদের উপরে থাকা গার্ডদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৭ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় স্বয়ং গাদ্দাফীর ভগ্নীপতি, গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান আব্দুল্লাহ সেনুসী। তার কঠোর হুমকি এবং বিভিন্ন সংস্কারের আশ্বাসে ২৯ তারিখ ভোরের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

আরো পড়ুন: দ্য প্রেসিডেন্ট: এক পতিত স্বৈরাচারের গল্প

সকালের দিকে গার্ডরা কারাগারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বন্দীদেরকে বিভিন্ন ব্লক এবং সেলে পুনর্বিন্যাস করতে থাকে। যারা কম ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধী ছিল এবং যারা সেল থেকে বের হয়নি, তাদেরকে সরিয়ে সিভিল এবং মিলিটারি ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। আর যারা সেল থেকে বেরিয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল, তাদেরকে পলিটিকাল উইংয়ের ব্লকগুলোর মাঝে অবস্থিত খোলা মাঠে হাঁটাচলার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর বেলা পৌনে এগারোটার দিকে শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যাগুলোর মধ্যে একটি। ছাদের উপর থেকে মাঠের বন্দীদের উপর প্রথমে পরপর দুইটি গ্রেনেড চার্জ করা হয়। এরপরই শুরু হয় অবিরাম মেশিনগানের গুলি বর্ষণ। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই আবু সেলিম কারাগারের ১৭০০ বন্দীর মধ্যে ১২৭০ বন্দীকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আবু সেলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার ১২৭০ বন্দীর একজন ছিল পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজীর আইনজীবী ফাতহি তারবিলের ভাই ইসমাঈল তারবিল, যে ইসলামপন্থী মৌলবাদীদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৮৯ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিল। এছাড়াও ঐ হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিল তার শ্যালক এবং চাচাতো ভাই। অন্য অনেকে ভয়ে চুপ করে থাকলেও ফাতহি ছিল ব্যতিক্রম। সে তার ভাই এবং অন্য বন্দীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটা জানার চেষ্টা করতে থাকে। বলা বাহুল্য, গাদ্দাফীর সরকার তার এই কর্মকাণ্ডকে সুনজরে দেখেনি। ফলে তাকে বারবার গ্রেপ্তার বরণ করতে হয়।

২০০৯ সালে সে নিহত বন্দীদের আত্মীয়-স্বজনদেরকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য “দ্যা অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা মার্টায়ার্স অফ দ্যা আবু সেলিম ম্যাসাকার” নামে একটি সংগঠন চালু করে। কিন্তু সরকারের চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে সেটা বন্ধ করে দিতে হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ফাতহিকে মোট পাঁচবার গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে একবার তাকে সর্বোচ্চ দুই বছর বিনা বিচারে বন্দী থাকতে হয়েছিল। সে সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয় ২০১১ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ঠিক গাদ্দাফী বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে। আর তার এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় ২০১১ সালের আরব বসন্তের লিবীয় সংস্করণ।

দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাটির প্রথম পর্ব

দুই. বিদ্রোহ থেকে গৃহযুদ্ধ

২০১১ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্তের উষ্ণ বাতাস লিবিয়ার গায়েও দোলা দিতে শুরু করে। প্রথমে তিউনিশিয়া এবং এরপর মিসরের সরকার বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে লিবিয়ানদের একাংশ, বিশেষ করে গাদ্দাফী সরকারের হাতে নিহত এবং নির্যাতিতদের আত্মীয়-স্বজনরা এবং বিদেশে নির্বাসিত অ্যাকটিভিস্টরা লিবিয়াতেও সরকার পতনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জানুয়ারির শেষের দিক থেকেই তারা ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবে গাদ্দাফী বিরোধী প্রচারণা চালাতে শুরু করে এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, বিভিন্ন সংস্কার এবং অধিকতর স্বাধীনতার দাবিতে দেশব্যাপী “ইয়াওমুল গাযব” তথা ক্ষোভ দিবস পালনের আহ্বান জানাতে থাকে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখটা নির্বাচনের পেছনেও অবশ্য একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। ২০০৬ সালের এই দিনে একটি ড্যানিশ পত্রিকায় রাসূল (স) এর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে বেনগাজীতে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিলে পুলিশ বাধা দেয়। বাধা পেয়ে বিক্ষোভকারীরা গাদ্দাফী বিরোধী শ্লোগান দিলে পুলিশ গুলি চালায় এবং ঘটনাস্থলেই অন্তত ১২ জন নিহত হয়।

২০১১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি আসার আগেই গাদ্দাফীর সরকার সতর্ক অবস্থান নেয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে গোয়েন্দা বিভাগের লোক ফাতহি তারবিলকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে বেনগাজীর হাওয়ারির ইন্টারনাল সিকিউরিটি অফিসে নিয়ে যায়। ১৭ তারিখে বিক্ষোভের পরিকল্পনা থাকলেও তারবিলের গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শতশত বিক্ষুব্ধ মানুষ তার মুক্তির দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইন্টারনাল সিকিউরিটি অফিসের সামনের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে।

আবু সেলিম হত্যাকাণ্ডের শিকারদের বৃদ্ধা মায়েরা শ্লোগান দিতে থাকে, “নূদি, নূদি, ইয়া বেনগাজী।” অর্থাৎ, জাগো, জাগো, হে বেনগাজী। শুরু হয় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ। পুলিশ নিরস্ত্র মিছিলের উপর লাঠিচার্জ, জল-কামান এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে।

আরো পড়ুন: গাদ্দাফির পতনের ছয় বছর: কেমন আছে প্রবাসী বাংলাদেশীরা?

১৫ তারিখের মিছিলে মাত্র কয়েকশত মানুষ উপস্থিত হলেও পরদিন গ্রেপ্তারকৃত এবং আহতদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবেরা যোগ দেওয়ায় মিছিলের আকার বৃদ্ধি পায়। ১৭ তারিখে কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষ শুধু পাথর এবং লাঠি হাতে বেনগাজীর “কাতীবা” তথা মিলিটারি ব্যারাকের সামনে জড়ো হয়ে ভেতরে পাথর নিক্ষেপ করলে ভেতরে অবস্থিত গাদ্দাফীর সেনাবাহিনী মেশিনগান এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফটের ১৪.৫ এবং ২৩ মিলিমিটারের বুলেটের মাধ্যমে তার জবাব দেয়। নিহত হয় প্রচুর সাধারণ মানুষ।

১৭ তারিখ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শহর দার্‌না, আল-বেইদা, আজদাবিয়া এবং তবরুকেও সরকার বিরোধী মিছিল বের হয়। বিক্ষোভকারীরা লাঠি এবং পাথর নিক্ষেপ করে এবং পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের গুলিতে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হলেও পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দেওয়ায় এবং পূর্বাঞ্চলের জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থন বিক্ষোভকারীদের পক্ষে থাকায় ১৮ তারিখের মধ্যেই আল-বেইদা, তবরুক এবং দার্‌না সহ বিস্তীর্ণ পূর্বাঞ্চল সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারায়। বাকি থাকে শুধু বেনগাজীর কাতীবা।

১৫ তারিখ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত বেনগাজীতে মিছিলগুলো ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনতার, যাদের সম্বল ছিল শুধু লাঠি আর পাথর। কিন্তু মাত্র পাঁচ দিনের সংঘর্ষেই দুই শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ায় জনগণ ছিল মরিয়া। ২০ তারিখ সকালের দিক থেকেই পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনগণের কাতারে যোগ দিতে থাকে। শুরু হয় সশস্ত্র বিদ্রোহ। সরকারের কাছে ভারী মেশিনগান, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান, আর পদত্যাগকারী বিদ্রোহী সেনাদের কাছে কালাশনিকভ রাইফেল। সেদিন বিকেলে মাহদী মোহাম্মদ জিউ নামে এক যুবক তার গাড়িতে দুটো গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে কাতীবার দেয়ালের সামনে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মাহুতি দেয়। ভেঙ্গে পড়ে কাতীবার দেয়াল।

ভেতরে থাকা গাদ্দাফীর সেনাদের অধিকাংশই পালিয়ে যায়। অবশ্য পালিয়ে যাওয়ার আগে তারা ভেতরে থাকা সেনা, যারা বিদ্রোহীদের উপর গুলি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাদেরকে একটা রুমের মধ্যে আটকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় অন্তত আটজন। জিউর আত্মত্যাগের বিনিময়ে বেনগাজী গাদ্দাফীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়। বিদ্রোহী জনতা কাতীবার ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের হস্তগত হয় গাদ্দাফীর সেনাদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। বেনগাজী সহ সমগ্র পূর্বাঞ্চল কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক আইনজীবীর মুক্তি, কিছুটা সংস্কার, কিছুটা স্বাধীনতার জন্য, সেই আন্দোলন পুরাদস্তুর গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

স্পাই স্টোরিজ: এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনী

সত্যিকারের গুপ্তচরদের কাহিনী নিয়ে লেখা আমার নন-ফিকশন থ্রিলার বই। প্রকাশিত হয়েছে স্বরে অ প্রকাশনী থেকে। ঘরে বসে অর্ডার করতে পারেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে। মুদ্রিত মূল্য ২৭০ টাকা মাত্র। আর পড়ার পর রেটিং এবং রিভিউ দিতে পারবেন গুডরিডসের এই লিঙ্কে

তিন. ন্যাটোর হস্তক্ষেপ

ফেব্রুয়ারির বিদ্রোহ শুধুমাত্র পূর্বাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, লিবিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর মিসরাতা, জাওইয়া, পার্বত্য শহর জিনতান, এমনকি রাজধানী ত্রিপলীতেও সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে গাদ্দাফীর সরকারের আইনমন্ত্রী মোস্তফা আব্দুল জলিল, যে মাত্র কয়েকদিন আগেই বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করার জন্য বেনগাজীতে এসেছিল, সে পদত্যাগ করে। ২২ তারিখে গাদ্দাফী তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ ইউনূসকে বেনগাজীতে পাঠায় বিদ্রোহ দমন করার জন্য। কিন্তু ইউনূসও পদত্যাগ করে বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেয়।

একে একে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তেলমন্ত্রী সহ অন্যান্য প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও পদত্যাগ করতে থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা সহ দশটি দেশের লিবিয়ান রাষ্ট্রদূতরা একযোগে পদত্যাগ করে। আরব লীগে লিবিয়ার সম্পূর্ণ প্রতিনিধি দল একসাথে পদত্যাগ করে। বিদ্রোহীদের উপর বোমা বর্ষণের নির্দেশ দিলে সেই নির্দেশ অমান্য করে দুইজন লিবিয়ান পাইলট দুটো “মাইরেজ এফ ওয়ান” ফাইটার জেট নিয়ে মাল্টায় পালিয়ে যায়।

বিদ্রোহের বিপরীত চিত্রও অবশ্য ছিল। গাদ্দাফীর জন্মস্থান সিরত, পার্বত্য শহর বানিওয়ালিদ, দক্ষিণের সাবহা এবং রাজধানী ত্রিপলীতে প্রায় প্রতিদিনই গাদ্দাফীর পক্ষে বিশাল বিশাল মিছিল বের হত। মূলত বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কয়দিন পর থেকেই লিবিয়া কার্যত দুই ভাগ হয়ে পড়ে। সিরত ছাড়া প্রায় সম্পূর্ণ পূর্বাঞ্চল ছিল বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। অপরদিকে মিসরাতা এবং জিনতান ছাড়া প্রায় সম্পূর্ণ পশ্চিমাঞ্চল ছিল গাদ্দাফীর পক্ষে বা গাদ্দাফীর নিয়ন্ত্রণে।

আরো পড়ুন: গাদ্দাফিকে উৎখাত করতে গিয়ে আমেরিকা যেভাবে ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছিল!

মোস্তফা আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের নবগঠিত এনটিসি সরকার প্রথম দিকে বিদেশী সাহায্য চাইতে অস্বীকার করলেও গাদ্দাফী বাহিনীর প্রবল বিমান আক্রমণের মুখে জাতিসংঘের সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়। পশ্চিমারাও গাদ্দাফীকে সরানোর এই মোক্ষম সুযোগটা লুফে নেয়। ১৭ই মার্চ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কোন বিরোধিতা ছাড়াই লিবিয়াতে নো-ফ্লাই জোন কার্যকরের সিদ্ধান্ত এবং নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলিউশন ১৯৭৩ পাশ করা হয়, যার বলে জাতিসংঘ বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করার জন্য যেকোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

১৯শে মার্চ সন্ধ্যায় যখন গাদ্দাফী বাহিনী বেনগাজীর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়, ঠিক তখনই ফ্রান্স লিবিয়াতে বিমান হামলা শুরু করে এবং গাদ্দাফী বাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যর্থ করে দেয়। এর পরপরই আমেরিকা শুরু করে “অপারেশন অডিসি ডন” নামের বিশেষ অপারেশন, যেটা এক রাতের মধ্যেই ১১০টা টমাহক ক্রুজ মিজাইল নিক্ষেপের মাধ্যমে গাদ্দাফীর এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ফলে প্রায় নিশ্চিত পরাজয় এবং সম্ভাব্য গণহত্যা থেকে বেঁচে যায় বিদ্রোহীরা, আর পিছু হটতে বাধ্য হয় গাদ্দাফী বাহিনী।

কিছুদিনের মধ্যেই লিবিয়াতে আক্রমণের মূল দায়িত্ব গ্রহণ করে ন্যাটো। জাতিসংঘের প্রস্তাবে শুধু বেসামরিক লোকজনদেরকে রক্ষা করার কথা থাকলেও বাস্তবে ন্যাটো গাদ্দাফী বাহিনীর উপর আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে থাকে। বিদ্রোহীরা আবার বেনগাজী থেকে শুরু করে রাসলানূফ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। গাদ্দাফী তার অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দেয় এবং নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও মিলিটারি ট্রেনিং প্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র বিতরণ করে। তাদের প্রবল আক্রমণে বিদ্রোহীরা রাসলানূফ থেকে পিছু হটে তেল সমৃদ্ধ শহর ব্রেগায় গিয়ে স্থির হয়। ব্রেগাতে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েকমাস পর্যন্ত এই অচলাবস্থা বিরাজ করে।

Manob Jamin 02
দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাটির দ্বিতীয় পর্ব

চার. ত্রিপলীর পতন

মে-জুন-জুলাই মাসগুলোতে যুদ্ধ অনেকটা বৈচিত্র্যহীনভাবে চলতে থাকে। বিদ্রোহীরা ন্যাটোর সহযোগিতায় কিছুটা এগোয়, আবার গাদ্দাফীর সেনাবাহিনীর আক্রমণে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এপ্রিলের ৩০ তারিখে ন্যাটোর বিমান হামলায় নিহত হয় গাদ্দাফীর ছোট ছেলে সাইফুল আরব এবং তিন দৌহিত্র; কিন্তু একই ভবনে থেকেও বেঁচে যায় গাদ্দাফী।

মে মাসের ১৫ তারিখে প্রায় তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর মুক্ত হয় মিসরাতা। ২৮শে জুলাই পার্বত্য এলাকা জাবাল নাফূসার (নাফূসা মাউন্টেইন্স) বিদ্রোহীরা নিজেদের এলাকা মুক্ত করে ত্রিপলী অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। এই সময় কাতার প্লেনে করে মিসরাতায় এবং ফ্রান্স প্যারাশ্যূটের মাধ্যমে নাফূসা মাউন্টেইন্সে বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র দেওয়ার মাধ্যমে তাদের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান করে তোলে।

২৮শে জুলাই রহস্যজনকভাবে বিদ্রোহীদের আর্মড ফোর্সের কমান্ডার আব্দুল ফাত্তাহ ইউনূস নিহত হয়। ইউনূসের মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্রোহীরা নবোদ্যমে ব্রেগা আক্রমণ করে এবং প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অপরদিকে মিসরাতা এবং জাবাল নাফূসার  বিদ্রোহীরা একে একে জিলিতান, গারিয়ান, জাওইয়া প্রভৃতি শহরের দখল নেওয়ার মাধ্যমে ১৬ই আগস্টের মধ্যে ত্রিপলীকে চারপাশের শহরগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

আরো পড়ুন: গাদ্দাফীর জীবনের শেষ দিনগুলো

২০শে আগস্ট, রমজান মাসের ২০ তারিখে বিদ্রোহীরা যখন ত্রিপলীকে চারদিক থেকে সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলে, ঠিক সেদিন ইফতারের পরপরই ত্রিপলীর তাজুরা, ফাশলুম, সুক্ব-আল-জুমা সহ বিভিন্ন এলাকার জনগণ গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। উপর থেকে ন্যাটোর আক্রমণ, এবং ভেতর-বাহির দুই থেকেই বিদ্রোহীদের আক্রমণে গাদ্দাফী বাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক রাতের মধ্যেই ত্রিপলীর অধিকাংশ এলাকা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২১ তারিখ রাতে বিদ্রোহীরা ত্রিপলীর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত গ্রীণ স্কয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যেটা মাত্র আগের দিন রাতেও গাদ্দাফী সমর্থকদের ভীড়ে পরিপূর্ণ ছিল। এনটিসি সরকার গ্রীণ স্কয়ারের নাম পরিবর্তন করে “মাইদান আশ্‌শুহাদা” তথা মার্টায়ার্স স্কয়ার নামকরণ করে।

তিন দিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ২৩ তারিখে বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফীর বা’ব আল আজিজীয়া কম্পাউণ্ডের পতন ঘটে। ধীরে ধীরে আবু সেলিম, হাদবা সহ অবশিষ্ট এলাকাগুলোতেও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্রোহীরা গাদ্দাফীর ছেলেমেয়ে এবং আত্মীয়স্বজনদের বাড়িগুলো দখল করতে থাকে। মিডিয়াতে উঠে আসতে থাকে ৪২ বছর ধরে অপ্রকাশিত গাদ্দাফীর পরিবারের অকল্পনীয় বিলাসবহুল জীবনযাপন, মাটির নিচে তৈরি বিভিন্ন টানেল, পারমাণবিক আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়ার উপযোগী বিভিন্ন গোপন আস্তানার চিত্র।

২৭ তারিখে পাঁচটি মার্সিডিজ বেঞ্জে করে গাদ্দাফীর দ্বিতীয় স্ত্রী সাফিয়া, মেয়ে আয়েশা, এবং দুই ছেলে মোহাম্মদ এবং হানিবাল সপরিবারে বর্ডার পাড়ি দিয়ে আলজেরিয়ার দিকে যাত্রা করে। তাদের সাথে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, ক্যাশ টাকা এবং সোনার বার ছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে আসে। গাদ্দাফী এবং তার চার ছেলে সাইফুল ইসলাম, খামীস, সা’দী এবং মৌতাসেম আত্মগোপনে চলে যায়। পতন ঘটে লৌহমানব হিসেবে পরিচিত গাদ্দাফীর ৪২ বছরের শাসনের। গাদ্দাফীর সমর্থকদের দখলে থাকে শুধু পার্বত্য এলাকা বানিওয়ালিদ, দক্ষিণের সাবহা, কুফরা এবং গাদ্দাফীর জন্মস্থান সিরত।

পাঁচ. গাদ্দাফীর মৃত্যু

ত্রিপলীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরপরই বিদ্রোহীরা নজর দেয় গাদ্দাফীর দখলে থাকা অবশিষ্ট শহরগুলোর উপর। এরমধ্যে সিরত ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কোস্টাল হাইওয়ের উপর অবস্থিত। এছাড়া গাদ্দাফীর জন্মস্থান হওয়ায় এবং বিদ্রোহের শুরু থেকেই গাদ্দাফীর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ায় সিরতের প্রতি বিদ্রোহীদের বিশেষ ক্ষোভ ছিল।

রোযার ঈদের পরপরই, ২রা সেপ্টেম্বর, বিদ্রোহীরা বানিওয়ালিদ আক্রমণ করে। একই সাথে তারা সিরতের দুই দিকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিয়ে সিরতকে এক প্রকার ঘিরে ফেলে এবং বারবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে সময় বৃদ্ধি করতে থাকে। সিরতকে গাদ্দাফীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হত। তাই বিদ্রোহীরা আলোচনা এবং আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সিরতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা নিশ্চিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়াতে চাইছিল। কিন্তু এর মাঝেই সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে সিরতে এমন একটা  ঘটনা ঘটে, যার ফলে পুরো যুদ্ধ সম্পূর্ণ নতুন একটা গতিপথ পায়।

সিরতের রক্বম ওয়াহেদ (ডিস্ট্রিক্ট নাম্বার ওয়ান) নামক এলাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল মিসরাতী ক্বাবিলার (গোত্রের)। স্বভাবতই তারা ছিল গাদ্দাফী বিরোধী। কিন্তু সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা এতদিন নিশ্চুপ ছিল। তাদের অনেকে এমনকি সবুজ পতাকা নিয়ে গাদ্দাফীর পক্ষে মিছিলও করত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেকেই গোপনে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল।

এরকম একটা পরিবার ছিল সাফরুনী পরিবার। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে গাদ্দাফী বাহিনী সাফরুনীর বড় ছেলেকে গ্রেপ্তারের জন্য তার বাড়ি ঘিরে ফেলে। ধরা পড়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, তাই সে ধরা না দিয়ে বিদ্রোহীদের চাঁদ-তারা খচিত তিন বর্ণের পতাকা নিয়ে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় গোলাগুলি। সাফরুনীদের পুরো বাড়ি রকেট লঞ্চার দিয়ে ধসিয়ে দেওয়া হয়। সাফরুনী এবং তার ছেলে মারা যায়। আর গাদ্দাফীর পক্ষের মারা যায় পাঁচজন।

ইমেইলের মাধ্যমে নতুন পোস্টের আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করে 45 জনের সাথে যোগ দিন।

গোলমালটা বাঁধে সাফরুনীর ছেলেকে নিয়ে। সে মারা গিয়েছিল ধারণা করে তাকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু লাশ গোসল করানোর জন্য বের করতে গিয়ে দেখা যায় যে, সে আসলে তখনও মরেনি। এই সংবাদ লোকাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিডিয়া তার স্বভাব অনুযায়ী ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জীবন্ত মানুষকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মত এই অমানবিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে। এর ফল হিসেবে ক্ষিপ্ত মিসরাতার বিদ্রোহী যোদ্ধারা সিরত আক্রমণের জন্য দলে দলে এসে জমা হতে থাকে এবং সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই সিরত আক্রমণ করে বসে।

১৫ই সেপ্টেম্বর বিকেল বেলা মিসরাতার যোদ্ধারা প্রথম সিরতে প্রবেশ করে। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে মূল শহরের ভেতরে বেশিক্ষণ থাকতে না পেরে তারা শহরের বাইরে গিয়ে অবস্থান নিয়ে শহরের উপর আক্রমণ করে। তাদের প্রবল আক্রমণে এবং ন্যাটোর মুহূর্মুহূ বিমান হামলায় মাত্র দুই ঘণ্টার যুদ্ধেই শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নিহত হয় শতাধিক, যাদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক।

পরদিন সকাল থেকেই সিরতের সাধারণ মানুষ সিরত ছেড়ে পালাতে থাকে। পেছনে রয়ে যায় শুধু গাদ্দাফীর সৈন্যরা এবং আগের দিনের আক্রমণে নিহতদের প্রতিশোধ পরায়ণ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুরা। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মিসরাতার যোদ্ধারা সিরতকে চারদিক থেকে ঘিরে মাত্র ১৫ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। তাদের সাথে পূর্ব দিক থেকে এগিয়ে আসা বেনগাজীর যোদ্ধারাও যোগ দেয়। অক্টোবরের ১৭ তারিখের মধ্যে বিদ্রোহীরা সিরতের প্রায় সবটুকু মুক্ত করে ফেলে। ততদিনে বানিওয়ালিদ সহ লিবিয়ার সব শহরেই বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। সাড়ে ১৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের লিবিয়ার মধ্যে গাদ্দাফীর সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে শুধু সিরতের রক্বম এতনীন তথা ডিস্ট্রিক্ট নাম্বার টু নামের মাত্র দুই বর্গ কিলোমিটারের ক্ষুদ্র একটি এলাকা।

আরো পড়ুন: ফ্রান্স কেন গাদ্দাফি হত্যার মিশনে নেমেছিল?

অক্টোবরের ২০ তারিখে সকাল ৮টার দিকে এই রক্বম এতনীনের ভেতর থেকে গাদ্দাফী বাহিনীর প্রায় ৪০টি গাড়ির একটি বহর বের হয়ে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু অল্প কিছুদূর যেতে না যেতেই ন্যাটোর বিমান হামলায় সেই বহরের অন্তত ১১টি গাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ততক্ষণে বিদ্রোহীরা যোদ্ধারাও চারপাশ থেকে এসে সেখানে আক্রমণ শুরু করে। বেঁচে যাওয়া গাদ্দাফীর সৈন্যেরা এদিক সেদিক পালাতে শুরু করে। অনেকেই ঘটনাস্থলে মারা পড়ে। নিহতদের মধ্যে ছিল গাদ্দাফীর প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবু বকর ইউনূস জাবের। আর জীবিত ধরা পড়ে গাদ্দাফীর ছেলে মৌতাসেম, এবং স্বয়ং গাদ্দাফী নিজে।

ন্যাটোর হামলা এবং বিদ্রোহীদের গোলাগুলি থেকে বাঁচতে গাদ্দাফী রাস্তার পাশে নির্মাণাধীন একটি সুয়েজ পাইপের ভেতরে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকেই বিদ্রোহীরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এবং কিল-ঘুষি-লাথি মেরে, রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতনের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলি করে হত্যা করে। তার ছেলে মৌতাসেমকেও একইভাবে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ আট মাসের গৃহযুদ্ধ, অন্তত ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর গাদ্দাফীর ৪২ বছরের শাসনের রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। লিবিয়া প্রবেশ করে নতুন একটি অধ্যায়ে, যেখানে সবার চোখে স্বপ্ন গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার, কিন্তু আশঙ্কা গোত্রগত লড়াই, বিভেদ এবং বিদেশী শক্তির আগ্রাসনের।

গাদ্দাফীর মৃত্যুর পর অতিক্রান্ত হয়েছে পাঁচটি বছর। লিবিয়া স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে ঠিকই, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের পথে কিছুটা এগিয়েও ছিল। কিন্তু রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা, অনভিজ্ঞতা, অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি মোহ এবং যুদ্ধের সময় মিলিশিয়াদের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়া অস্ত্রের কারণে মানুষ আজও তাদের বিপ্লবের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। বরং বিভিন্ন শহর এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে আদর্শিক এবং স্বার্থগত দ্বন্দ্ব এত চরম আকার ধারণ করেছে যে, ফেব্রুয়ারির বিপ্লব আদৌ কখনও সাফল্যের মুখ দেখবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মানবজমিনে প্রকাশিত লেখাটির প্রথম পর্বের লিংক এখানে এবং দ্বিতীয় পর্বের লিংক এখানে 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *